শাকিব বিপ্লব :: বরিশালের আইন-শৃঙ্খলা স্থিতিশীল রাখার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা এখন নিজেদের জীবন রক্ষায় অধিকতর সজাগ হয়ে উঠেছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গণসচেতনতায় মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক ভিক্তিক ভ’মিকা রাখতে গিয়ে পুলিশই এখন এই মরনঘাতীর ছোবলের মুখে পড়েছে। একজন পুলিশ কনস্টেবল করোনার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনায় গোটা জেলায় এই বাহিনীর ভিতরে একধরনের চাপা আতঙ্ক-উৎকন্ঠা দেখা দিয়েছে। গতকাল বুধবার ২৭ মে রাতে সোহেল মাহমুদ নামক এই পুলিশ কনস্টেবল করোনা রোগের উপসর্গ নিয়ে শেবাচিমে ভর্তি হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই তিনি মারা যাওয়ায় এই উৎকন্ঠা আরও চেপে ধরেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। মেট্রো পুলিশের ট্রেনিং অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার শাখায় কর্মরত এই পুলিশ সদস্য প্রাণঘাতি এই ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়। এ মৃত্যুর ঘটনায় শোকাহত পুলিশ-প্রশাসন অন্যান্য সদস্যদের মনোবল অটুট রাখতে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেছে, এমনটি খবর পাওয়া গেছে।

প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র বলছে, করোনার বিস্তার বরিশালে প্রসারিত হওয়ায় জেলা ও মেট্রো পুলিশ নিজেদের আত্মরক্ষায় প্রথম থেকেই সতর্কতা অবলম্বনে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা বিভিন্ন দিক-নিদের্শনা দেওয়াসহ প্রটেকশনমূলক উপকরন সরবরাহ করে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের আত্মরক্ষার উপর আগেভাগেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু গণমানুষের প্রাণ রক্ষায় ভ’মিকা রাখতে গিয়ে বাধ্যতামূলক তাদের সংস্পর্শে যাওয়ায় করোভাইরাস আপনা-আপনি পুলিশ সদস্যদের স্পর্শ করতে শুরু করে।

পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, জেলার চেয়ে মেট্রোপলিটন পুলিশ সদস্যদের মধ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ। জেলার ১০ টি থানায় এপর্যন্ত ১৪ জন করোনা উপসর্গ নিয়ে অস্থিরতায় ভুগলে তাদের টেস্টের মুখোমুখি করা হলে ২ জন পজেটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়। আক্রান্ত ২ জনই জেলা পুলিশ লাইনে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে এই ২ জনের মধ্যে ১ জন শেবাচিমে, অন্যজন নিজবাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। অপর ১২ জন হোম কোয়ারান্টাইনে রয়েছেন।
কিন্তু ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মেট্রোপুলিশের মধ্যে। মেট্রো এলাকার বিভিন্ন থানাসহ বিভিন্ন শাখায় কর্মরত অন্তত ৩৫ জন পুলিশ সদস্য করোনার ছোবলে কাবু হয়ে এখন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এদের মধ্যে ৭ জনের অবস্থা অবনতির দিকে ধাবিত হলে ঈদপূর্ব ২ দিন আগে তাদের বিশেষ ব্যাবস্থায় ঢাকা রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়।এর আগে পুলিশ সদস্যদের করোনা টেস্টের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সার্বিক দায়ত্ব দেয়া হয়।

বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানার ওসি অপারেশন মোজাম্মেল হোসেনকে। তিনি জানান, সন্দেহের অলোকে এপর্যন্ত মেট্রোপুলিশের প্রায় ২৪৬ জন সদস্যকে করোনা টেস্ট করানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জনের রেজাল্ট পজিটিভ আসলেও তাদের সান্নিধ্যে থাকা আরও শতাধিক সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যারাক ও বাড়িতে হোম কোয়ারাইন্টাইনে রাখা হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ নির্ধারিত ১৪ দিন অতিক্রম করে স্বাভাবিক জীবনযাপনশুরু করেছে।

অপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, এরপর থেকেই মেট্রো পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে মাঠ পর্যায়ের সদস্যরা করোনা থেকে মুক্ত থাকতে আরও বেশী সচেতন হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার আঃ রাকিবুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানান, করোনায় আক্রান্ত পুলিশ সদস্যদের স্বাস্থ্যগত খোঁজখবর এবং পরিস্থিতি মনিটরিংয়ে একটি ম্যানেজমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঐ কমিটির সভাপতি এই পুলিশ কর্মকর্তা দাবী করেন, সম্ভবত মেট্রো পুলিশেও অনূরূপ ব্যাবস্থা নেয়া হয়।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোঃ সাহাবুদ্দীন খান অভিন্ন মন্তব্য করে এই প্রতিবেদককে বলেন, মেট্রো পুলিশেও এধরনের একাধিক কমিটি রয়েছে। জেলা অপেক্ষা শহরে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের করোনা আক্রান্তের সংখ্যাগত দিক বেশী থাকার বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, এর যথেষ্ট কারন, সম্ভাবনা ও যৌক্তিকতা রয়েছে। বিভাগীয় এই শহরে বিভিন্ন স্থানের মানুষের আনাগোনা ও হাট-বাজারের সংখ্যা বেশী থাকা এবং মাঠ পর্যায়ে কাজের ক্ষেত্র দীর্র্ঘ বিস্তৃত হওয়ায় দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে পুলিশ সদস্যদের মানুষের কাছাকাছি যেতে হচ্ছে। আবার কখনও আসামী ধরার ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িতে না জেনেও প্রবেশের ঘটনাও সংক্রমিত হওয়ার অন্যতম একটি কারন হতে পারে। ফলে কখন, কার সংস্পর্শ থেকে করোনার ছোবলের আওতায় পড়ছে পুলিশ সদস্যরা তা বুঝে উঠা সম্ভব নয়।

এসব ভাবনাকে সামনে রেখেই পুলিশ সদস্যদের মাঠে সক্রিয় থাকতে বাধ্য থাকতে হচ্ছে। একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা , অন্যদিকে করোনা প্রতিরোধে লকডাউনের এই শহরে মানুষের গতিবিধি সামাল দেয়ার পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকালে করোনাভাইরাস অলক্ষ্যেই তাদের শরীরে প্রবেশের সুযোগ নিচ্ছে বলে অভিমত রয়েছে। একারনে জেলাসহ মেট্রো পুলিশ সদস্যদের বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্রের জায়গায় সুরক্ষার তাগিদ দূর্যোগের শুরু থেকেই দিয়ে আসা হচ্ছিলো, এমনটি দাবী করেন মেট্রোপুলিশ কমিশনার।

তিনি জানান, পুলিশ সদস্যদের আত্মরক্ষার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহনের মধ্যে তাদের থাকার জায়গা পুনঃবিন্যাস করে আরও প্রসারিত করা হয়েছিলো। বিভিন্ন ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যদের নতুন ব্যারাক ও স্কুলসহ নবনির্মিত বিশেষ ভবনে দূরত্ব বজায় রেখে আবাসনের জায়গায় প্রতিরোধমূলক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। সেই সাথে দেয়া হয় করোনাভাইরাস প্রটেকশনের উপকরন। অবশ্য অপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা দাবী করেন, সরবরাহকৃত উপকরনের মধ্যে পিপিই ও মাস্ক কতোটা উন্নতমানের তা প্রশ্নবিদ্ধ। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যরা কাজের সময় বেখেয়ালে মাস্ক ও পিপিই ব্যাবহারের সুযোগ পাচ্ছেনা অথবা নিচ্ছেননা।
মোদ্দাকথায়, মেট্রোপুলিশ কমিশনার সাহাবুদ্দিন খান ও জেলা পুলিশের অতিরিক্ত সুপার আঃ রাকিবুল ইসলাম একই ভাষায় মন্তব্য করেন যে, করোনাভাইরাস মোকাবিলায় যুদ্ধের অনুকরনেই মুখোমুখি অবতীর্ণ হতে হচ্ছে পুলিশ সদস্যদের। সেক্ষেত্রে যুদ্ধের মাঠে ফ্রন্টলাইনে থাকলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা মেনে নিয়েই দেশাত্মবোধের পরিচয় দিতে গিয়ে করোনার আঘাত পুলিশ বাহিনীকে আহত করছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে সোহেল মাহমুদ এর মৃত্যুকে তারা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছে না। ২৭ মে রাতের এই বিয়োগাত্বের ঘটনাকে মেট্রো পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছে বলে জানা যায়। অপ্রত্যাশিত এই মৃত্যু পরবর্তী পুলিশের মধ্যে আরও সতর্কতা সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবী করেন পুলিশ কমিশনার। বিপরীতে পুলিশ সদস্যদের মনোবল ভেঙে পড়েছে কিনা, এমন সম্ভাবনা নাকোচ করে দিয়ে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে যেকোনও মুহূর্তে-দূর্যোগে মৃত্যুকে সাথে নিয়েই দায়িত্ববোধের জায়গায় অনঢ় থাকতে হয়। শীর্ষ এই পুলিশ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, মেট্রো পুলিশের ট্রেনিং অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার শাখায় কর্মরত কনস্টেবল সোহেল মাহমুদ’র মৃত্যু তাদেরকে একধরনের সতর্কবার্তা দিলো আগামীর জন্য।
বিষয়টি বিবেচনা করে পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তায় আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বললেন, সম্মুখ্য যুদ্ধে যখন থাকতেই হবে তখন সকল পুলিশ সদস্যদের নিজস্ব সচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। সোহেল মাহমুদ আসলে করোনায় আক্রান্ত ছিলো কিনা সেবিষয়টি তারা এখনও নিশ্চিত নয়।

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাত ৯ টায় এই পুলিশ কনস্টেবল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে শেবাচিমে নিয়ে আসা হয় । সে পূর্ব থেকেই ডায়াবেটিস ও এ্যাজমা রোগাক্রান্ত ছিলো। হাসপাতালটির পরিচালক ডা. এসএম বাকির হোসেন এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেন, জ্বর, সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভোগায় সোহেল মাহমুদকে শেবাচিমে ভর্তির পর প্রথমে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিলো করোনা উপসর্গের রোগী হিসেবে। তার শারিরীক অবস্থার অবনতির প্রেক্ষাপটে ভ্যান্টিলেশন দেওয়াও হয়েছিল। আকস্মিক রাত ১২ টার পর সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তিনি প্রকৃত অর্থে করোনা রোগে আক্রান্ত ছিলেন কিনা তা নিশ্চিত হতে তার দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আজ বুধবার তা পরীক্ষার জন্য পিসিআর ল্যাবে পাঠানোর কথা রয়েছে।

পুলিশের আর একটি সূত্র জানায়, কনস্টেবল সোহেল মাহমুদের আকস্মিক মৃত্যুর খবর পেয়ে ঐ রাতেই মেট্রোপুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা শেবাচিমে ছুটে যান। এবং তার ভর্তি থেকে মৃত্যুপূর্ব পরিস্থিতি অবগত হন। মেট্রোপুলিশ কমিশনারের তত্বাবধানে রাতেই তার মৃতদেহ পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার পাঙ্গাশিয়া গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানকার স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, আজ দুপুরে সোহেল মাহমুদকে করোনাভাইরাসে মৃত ব্যাক্তির দাফনের আদলেই তাকে বিশেষ ব্যাবস্থাপনায় সমাহিত করা হয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here